সারাদেশে বিপন্ন হচ্ছে জলের পাখি ডাহুক

মাঝারি আকৃতির জলের পাখি বুকধলা ডাহুক। ডাহুক খুব সতর্ক পাখি। আত্মগোপনে পারদর্শী। এই পাখিটি খুব ভীরু বলেই কি এত সুন্দর!

13

জেলা প্রতিনিধি –

মাঝারি আকৃতির জলের পাখি বুকধলা ডাহুক। ডাহুক খুব সতর্ক পাখি। আত্মগোপনে পারদর্শী। এই পাখিটি খুব ভীরু বলেই কি এত সুন্দর!

পুকুর, খাল, জলাভূমি, বিল, নদীর পাড়ের গর্তে তাদের বসবাসের জন্য প্রিয় স্থান। তবে দ্রুত নগর বিস্তৃতির ফলে হারিয়ে যাচ্ছে সুন্দর এই পাখি। তবে ভৈরবসহ সাতটি খাল খননের ফলে মেহেরপুরে বেড়েছে এর প্রজনন হার।

এক দশক আগেও মেহেরপুর জেলার নদি খাল, বিল-ঝিল, ডোবা, নালা-দীঘির পাশের ঝোপঝাড়ে দল বেঁধে বাস করতি এই বুকধলা ডাহুক পাখি।

গ্রামাঞ্চলের পুকুর পাড়ের ঝোপঝাড়ে সন্ধ্যেবেলা ডাহুকের ডাক শোনা যেত। গভীর রাতেও ডাহুকের ডাকে অনেকের ঘুম ভাঙতো। তবে আজকাল আর সেভাবে ডাহুকের কণ্ঠ শোনা যায় না।

একসময় বর্ষা ও শরতে ডাহুকরা বাড়ির গৃহপালিত হাঁস মুরগির সঙ্গে বেড়াতো। এখন আর তাদের আনাগোনা সচারচার চোখে পড়ে না। সারা দেশে ডাহুক পাখি এখন হারিয়ে যেতে শুরু করেছে।

বর্ষাকাল এদের প্রজনন ঋতু। এসময় তারা বাসা করে পানির কাছেই ঝোপঝাড়ের ভেতরে অথবা ছোট গাছের ঝোপযুক্ত ডালে। নিরাপত্তা ঠিকঠাক থাকলে মাটিতেও বাসা করে এই পাখি। ৫-৭টি ডিম পাড়ে এরা, ডিমের রং ফিঁকে হলুদ বা গোলাপি মেশানো সাদা।

ডাহুক-ডাহুকি দু’জন মিলেই ডিমে তা দেয়। বাচ্চার রং সব সময় হয় কালো। ডিম ফোটে প্রায় ২১-২৪ দিনে। আর ২৪-৩০ ঘণ্টা পরই বাচ্চারা বাসা ছাড়ে।

মাস তিনেক পরে বাচ্চারা আলাদা জীবন বেছে নেয়। প্রজননের সময় একটি পুরুষ ডাহুক অন্য একটি পুরুষ ডাহুককে সহ্য করতে পারে না। দেখলেই তারা মারামারি করে। এই পাখি লড়াকু প্রকৃতির। ডাহুকের প্রিয় খাদ্য জলজ পোকামাকড় ও কীটপতঙ্গ। এছাড়াও শাপলা-পদ্ম ফুলের নরম অংশ, কচি পানিফল, জলজ শেওলা, লতাগুল্মের নরম অংশ, ধান, কাউন, ডাল, সরিষা, শামুক, কেঁচো, জোঁক, মাছ, ছোট মাছ, শাকসবজি ও ফল খেয়ে থাকে।

পাখিটি বাংলাদেশ, ভারত ছাড়াও দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার বিভিন্ন দেশে দেখা যায়। সারা পৃথিবীতে এক বিশাল এলাকা জুড়ে এরা বিস্তৃত, প্রায় ৮৩ লাখ ৪০ হাজার বর্গ কিলোমিটার এলাকা জুড়ে এদের আবাস।

তবে বর্তমানে তাদের আবাসস্থল ধ্বংস হচ্ছে। খাদ্য সংকট ও প্রজননকালীন সময়ে শিকারীদের উৎপাতসহ নানা কারণে হারিয়ে যাচ্ছে পরিবেশবান্ধব এ প্রজাতির পাখি। শিকারিদের হাত থেকে শেষ পর্যন্ত রক্ষা পাচ্ছে না গভীর বনজঙ্গলে বসবাসকারী ডাহুকগুলোও।

সম্প্রতি আই.ইউ.সি.এন এই প্রজাতিটিকে নুন্যতম বিপদগ্রস্থ বলে ঘোষণা করেছে। বাংলাদেশের বন্যপ্রাণী আইনে এ প্রজাতিটিকে সংরক্ষিত ঘোষণা করা হয়েছে।

মেহেরপুরের গাংণী সরকারী ডিগ্রী কলেজের ভুগোল পরিবেশবিদ সাবেক সহ:অধ্যাপক এনামূল আযীম বলেন, ‘মেহেরপুর থেকে ডাহুক অনেকটা বিপন্ন হয়ে যাচ্ছিল।এখন মাঝে মধ্যে দেখা যায়। ঝোপঝাড় ধ্বংসের ফলে ডাহুকের বর্তমান অবস্থা খুব বেশি ভালো নয়। প্রকৃতিতে এদের নিরাপত্তা দিতে অবশ্যই এদের আবাসস্থল ধ্বংস বন্ধ করতে হবে। না হলে সেদিন আর বেশি দূরে নয় যেদিন বিপন্নের লাল তালিকায় লেখা হবে ডাহুক পাখির নাম।’

তবে আশার বানি শোনালেন মেহেরপুর বার্ডক্লাবের সভাপতি, প্রকৃতি ও জীবন ক্লাবের উপদেষ্টা এম এ মুহিত তিনি বলেন ডাহুক পাখি ডোবা-নালা, পুকুর, ও খাল-বিলে বিচরণ করে। এবং জলের আসেপাশের ঝোপঝাড়ে এরা বাসা বাঁধে। মেহেরপুরে ভৈরব নদীর নাব্যতা হারিয়ে ফসলের মাঠে পরিনত হলে, ডাহুক পাখি খুব একটা চোখে পড়ত না। কিন্তু পাখি শিকারীরা চোখে পড়ার মত ছিল।  বর্তমানে মেহেরপুরে ভৈরব নদী খনন করার পর যখন নদী নাব্যতা ফিরে পায়, তখন থেকে ধলাবুক ডাহুক বেশির ভাগ সময় দেখা মেলে। বর্তমানে পাখি শিকারীদের উৎপাত কমে যাওয়ার পর মেহেরপুরে বিভিন্ন গ্রাম অঞ্চলে আগের তুলনায় বর্তমানে বেশি ধলাবুক ডাহুক পখি দেখা যায়। এক কথায় বলতে গেলে বর্তমানে মেহেরপুরে ডাহুকের সংখ্যা অনেক বেড়ে গেছে। পুকুর ও খাল-বিলের পাশ দিয়ে হেটে গেলে ডাহুকের ডাক কানে ভেসে আসে।

এভাবে সারা দেশের জলাধার গুলো খনন ও সংরক্ষন করলে মেহেরপুরে যেমন ডাহুকের সংখ্যা বেড়েছে সারা দেশেও বেড়ে যাবে এর সংখ্যা প্রকৃতিতে এ সুন্দর পাখিটি আবার শোভা ছড়াবে।

 

এই বিভাগের আরও সংবাদ