অনিশ্চয়তা থেকে আত্মবিশ্বাসের পথে মুন্না

47

মেহেরপুর প্রতিনিধি: ১ সেপ্টেম্বর ২০২৬।

একসময় কাজ ছিল, স্থিরতা ছিল না। আয় হতো, কিন্তু নিয়মিত নয়। সামনে কী আছে-এই প্রশ্নের উত্তরও ছিল অনিশ্চিত। নিজের ভবিষ্যৎ নিয়ে যেমন চিন্তা ছিল, তেমনি পরিবারের প্রয়োজন মেটানো নিয়েও ছিল দুশ্চিন্তা। মেহেরপুরের তরুণ মোঃ মাহমুদ হাসান মুন্নার জীবনের গল্পটা ছিল এমনই। পরিশ্রম করার ইচ্ছা ছিল। কিছু একটা করার স্বপ্নও ছিল। কিন্তু শুধু ইচ্ছা থাকলেই তো হয় না- প্রয়োজন হয় দক্ষতার। প্রয়োজন হয় এমন একটি সুযোগ, যা একজন তরুণকে তার সামর্থ্য প্রমাণের জায়গায় পৌঁছে দিতে পারে। মুন্নার জীবনে সেই সুযোগ আসে কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে।

তিনি বলেন, “ একদিন প্রশিক্ষনের ভর্তি বিজ্ঞপ্তির মাইকিং শুনে  মেহেরপুর কলেজ অব ইঞ্জিনিয়ারিং এন্ড টেকনোলজি (MCET)-তে CISC-এর মাধ্যমে বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে বাস্তবায়িত ASSET প্রকল্পের আওতায় ৪থ সাইকেলে ম্যশনারী- লেভেল ২ প্রশিক্ষণে অংশ নেই আমি। প্রশিক্ষণটি আমার কাছে কেবল একটি কোর্স ছিল না; ধীরে ধীরে এটি হয়ে ওঠে আমার নিজের ভবিষ্যৎকে নতুনভাবে দেখার একটি সুযোগ। প্রশিক্ষণের সময় শুধু বইয়ের জ্ঞান নয়, হাতে-কলমে কাজ শেখার সুযোগ পায় আমি। কর্মক্ষেত্রে দায়িত্ব কীভাবে পালন করতে হয়, কাজের পরিকল্পনা কীভাবে করতে হয়, অন্যদের সঙ্গে সমন্বয় করে কীভাবে কাজ করতে হয়- এসব বিষয়ও শিখি। সবচেয়ে বড় পরিবর্তনটি আসে নিজের ওপর বিশ্বাসে। প্রশিক্ষণের আগে যে কাজের সুযোগগুলোকে অনিশ্চিত মনে হতো, দক্ষতা অর্জনের পর সেগুলোর দিকে অন্যভাবে তাকাতে শুরু করলাম আমি। নিজের সক্ষমতা নিয়ে তৈরি হয় আত্মবিশ্বাস “

এরপর আসে কর্মজীবনে প্রবেশের সুযোগ। বর্তমানে নকশা ইঞ্জিনিয়ারিং সার্ভিসে সাইট সুপারভাইজার হিসেবে কাজ করছেন মুন্না। প্রতিদিন তাকে সাইটের বিভিন্ন কাজ তদারকি করতে হয়। শ্রমিকদের কাজের সমন্বয় করতে হয়, নির্ধারিত দায়িত্ব বুঝে নিতে হয় এবং কাজ যথাযথভাবে সম্পন্ন হচ্ছে কি না, সেদিকেও নজর রাখতে হয়। কাজের ব্যস্ততা এখন তার জীবনের নিয়মিত অংশ। একসময় যে নিয়মিত আয়ের নিশ্চয়তা নিয়ে দুশ্চিন্তা ছিল, এখন সেই জায়গায় এসেছে কিছুটা স্বস্তি। নিজের প্রয়োজন মেটানোর পাশাপাশি পরিবারের জন্যও আর্থিকভাবে সহযোগিতা করতে পারছেন তিনি। মুন্নার কাছে এই পরিবর্তনের মূল্য তাই শুধু একটি চাকরি পাওয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।

তিনি বলেন, “ASSET প্রকল্পের প্রশিক্ষণ আমার জীবনে একটি নতুন পথ তৈরি করেছে। প্রশিক্ষণের আগে কর্মজীবন ও আয় নিয়ে অনেক অনিশ্চয়তার মধ্যে ছিলাম। CISC এর মাধ্যমে MCET- থেকে বাস্তব ভিত্তিক এই প্রশিক্ষণ নেওয়ার পর আমার কাজের দক্ষতা ও আত্মবিশ্বাস দুটোই বেড়ে যায়।”

কথার একপর্যায়ে নিজের বর্তমান অবস্থার কথা বলতে গিয়ে মুন্না বলেন, “প্রশিক্ষণ শেষে সেই দক্ষতাকে কাজে লাগিয়ে কর্মক্ষেত্রে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার সুযোগ পেয়েছি। বর্তমানে আমি নিয়মিত কাজ করছি এবং আমার আর্থিক অবস্থারও উন্নতি হয়েছে।”

তিনি আরো বলেন, “এই প্রশিক্ষণ আমাকে শুধু একটি কর্মসংস্থানের সুযোগ দেয়নি, বরং ভবিষ্যৎ নিয়ে নতুন করে স্বপ্ন দেখার সাহস দিয়েছে।”

মুন্নার গল্পে তাই সাফল্য মানে শুধু একটি পদ বা একটি কর্মস্থল নয়। সাফল্য হলো অনিশ্চয়তা থেকে একটু একটু করে বেরিয়ে আসা। নিজের দক্ষতার ওপর বিশ্বাস তৈরি করা। পরিবারের পাশে দাঁড়ানোর সক্ষমতা অর্জন করা। আর সবচেয়ে বড় কথা-আগামী দিন নিয়ে নতুন করে স্বপ্ন দেখার সাহস পাওয়া।

একজন তরুণের জীবনে একটি প্রশিক্ষণ কতটা পরিবর্তন আনতে পারে, মাহমুদ হাসান মুন্নার পথচলা তারই একটি ছোট্ট উদাহরণ। সঠিক সময়ে পাওয়া দক্ষতা উন্নয়নের সুযোগ কখনো কখনো শুধু একটি চাকরির দরজা খুলে দেয় না-খুলে দেয় সম্ভাবনার আরও অনেক দরজা।

এই বিভাগের আরও সংবাদ